শিরোনাম :
ইসলামপুর প্রেসক্লাবের নির্বাচন ঘিরে জটিলতা, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ পোশাক কারখানায় টার্গেটের নামে ‘শ্রমিক নির্যাতন’: আশুলিয়ায় সুমির মৃত্যুরহস্য ও ৯৯% কারখানার বন্দিদশা শেরপুরের শ্রীবরদীতে ড্রামের ভেতর থেকে নারীর মরদেহ উদ্ধার ৩০০ বছরের ঐতিহ্য, শ্রীপুরের দশমী মাঠে অর্ধশতাধিক প্রতিমার মিলনমেলা শেরপুরে বিয়ের ছয় দিনের মাথায় নববধূর মৃত্যু ঝিনাইগাতী সীমান্তে ১ লাখ ২৬ হাজার টাকার ভারতীয় মদ জব্দ কালীগঞ্জে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও আর্থিক সহযোগিতা প্রদান, উন্নয়নের বার্তা দিলেন চেয়ারম্যান প্রার্থী চপল পূজার আনন্দে সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে গোলাপগঞ্জে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গোলাপগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দ কাশিয়ানীতে নামাজ পড়ে ফেরার পথে ব্যক্তিকে কুপিয়ে জখম, মূল পরিকল্পনার অভিযোগ বড় ভাই বরকতের বিরুদ্ধে একদুয়ারিয়া শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন উপলক্ষে পূজা মণ্ডপ পরিদর্শণ ও শুভেচ্ছা বিনিময়
পোশাক কারখানায় টার্গেটের নামে ‘শ্রমিক নির্যাতন’: আশুলিয়ায় সুমির মৃত্যুরহস্য ও ৯৯% কারখানার বন্দিদশা

পোশাক কারখানায় টার্গেটের নামে ‘শ্রমিক নির্যাতন’: আশুলিয়ায় সুমির মৃত্যুরহস্য ও ৯৯% কারখানার বন্দিদশা

মনির হাসান জীবন: সাভারের আশুলিয়ায় অসুস্থ শরীরে ছুটি না পেয়ে কারখানায় কাজ করার সময় লাইন সুপারভাইজারের তীব্র মানসিক হেনস্থার শিকার হয়ে সুইং অপারেটর সুমি আক্তারের মৃত্যুর ঘটনাটি দেশের তৈরি পোশাক খাতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তবে এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ পোশাক কারখানার ভেতরে শ্রমিকদের ওপর চলা নিয়মিত অদৃশ্য দাসত্ব, নির্যাতন এবং জিম্মি দশার এক চরম বাস্তব রূপ। কারখানার সিএম (কাটিং ম্যানেজার), পিএম (প্রোডাকশন ম্যানেজার), লাইন চিফ এবং সুপারভাইজারদের নির্মম ‘টার্গেট’ পূরণের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে প্রতিনিয়ত লাখো শ্রমিকের গায়ের লোম খাড়া করা এমন মানবিক বিপর্যয় নীরবেই ঘটে চলেছে।
তৈরি পোশাক শিল্পের আড়ালে শ্রমিকদের দিন কাটে চরম আতঙ্কে। সাধারণ শ্রমিক ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন সকালে কারখানায় ঢোকার পর থেকেই শুরু হয় এক অলিখিত মানসিক যুদ্ধ। প্রতি ঘণ্টায় একজন শ্রমিককে কত পিস কাপড় সেলাই বা উৎপাদন করতে হবে, তার একটি নির্দিষ্ট ‘টার্গেট’ বেঁধে দেওয়া হয়। যদি কোনো শ্রমিক অসুস্থতা, ক্লান্তি বা অন্য কোনো কারণে সেই টার্গেট পূরণ করতে সামান্য দেরি করেন, তবেই শুরু হয় জিএম, পিএম কিংবা লাইন সুপারভাইজারদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, চিৎকার এবং চরম মানসিক হেনস্থা। আশুলিয়া আগামী অ্যাপারেলসে সুমি আক্তারের ভাইরাল হওয়া সিসিটিভি ফুটেজে ঠিক এই চিত্রই দেখা গেছে—যেখানে অসুস্থ সুমির টেবিলে থাপ্পড় মেরে, কাপড় কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে তাকে একপ্রকার মানসিকভাবে পিষে ফেলা হয়েছিল, যার পরপরই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ গার্মেন্টস কারখানায় পদক্রমের নিচের স্তরের কর্মকর্তাদের ক্ষমতা ও আচরণ প্রায়শই আইনকানুনের ঊর্ধ্বে চলে যায়। শ্রমিকরা মূলত তিনটি প্রধান স্তরের কর্মকর্তাদের কাছে সম্পূর্ণ জিম্মি থাকেন, যার মধ্যে প্রথম স্তরে আছেন সুপারভাইজার ও লাইন চিফ যারা সরাসরি ফ্লোরে শ্রমিকদের কাজের তদারকি করে এবং উৎপাদন বাড়ানোর জন্য শ্রমিকদের ওয়াশরুমে যাওয়ার সময় কিংবা পানি খাওয়ার সময়টুকু পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে সামান্য ভুলেই হাত থেকে কাজ কেড়ে নেয় বা চড়-থাপ্পড় মারে। দ্বিতীয় স্তরে আছেন পিএম (প্রোডাকশন ম্যানেজার) যাদের ওপর বায়ারদের অর্ডার সময়মতো শিপমেন্ট করার পুরো চাপ থাকে এবং তারা ফ্লোরের সুপারভাইজারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে সুপারভাইজাররা সেই ক্ষোভ ও চাপ উগরে দেয় সাধারণ শ্রমিকদের ওপর। আর তৃতীয় স্তরে সিএম (কাটিং ম্যানেজার) ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা কোনো শ্রমিক অসুস্থ হলে বা জরুরি পারিবারিক প্রয়োজনে ছুটির আবেদন করলে অধিকাংশ কারখানায় এই কর্মকর্তাদের পারমিশন বা অনুমতি পাওয়া এক প্রকার অসম্ভব যুদ্ধ হয়ে দাঁড়ায় এবং ছুটি চাইলে উল্টো চাকরি খেয়ে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়, যা শ্রমিকদের মুখ বুজে সব অত্যাচার সহ্য করতে বাধ্য করে।
পোশাক শ্রমিকদের এই জিম্মি দশা টিকিয়ে রাখার প্রধান হাতিয়ার হলো ‘চাকরিচ্যুতির ভয়’ এবং ‘কালো তালিকাভুক্ত (Blacklisted)’ করার হুমকি। একজন শ্রমিক যদি কোনো কর্মকর্তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উগ্র বা শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয় এবং আইডি কার্ড বা বায়োমেট্রিক ডেটা ব্যবহার করে অন্য কোনো কারখানাতেও যাতে সে চাকরি না পায় সেই ব্যবস্থা করা হয়। ফলে পেটের তাগিদে, পরিবারের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য ৯৯ শতাংশ শ্রমিকই এই বিষাক্ত ও অমানবিক কর্মপরিবেশে মুখ বুজে জিম্মি হয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। আশুলিয়ার সুমি আক্তারের এই করুণ মৃত্যু বাংলাদেশের পোশাক খাতের পেছনের সেই অন্ধকার সত্যকে আবারও সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। কারখানার কর্মকর্তাদের এই স্বেচ্ছাচারিতা ও জিম্মি করার সংস্কৃতি অবিলম্বে বন্ধ না হলে, পোশাক খাতের এই আপাত চাকচিক্য আর লাখো শ্রমিকের দীর্ঘশ্বাস ও লাশের স্তূপের মধ্যে কোনো তফাত থাকবে না।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




কপিরাইট © ২০২৪ || দি ডেইলি আজকের আলোকিত সকাল - সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত